বাড়ি ফিরল নূপুর

কার্ডিয়াক সার্জন হওয়ার প্রত্যয়ের কথা জানাতে গিয়ে ডা. সিয়াম বলেন, 'তখন কেবল এমবিবিএস ভর্তি হয়েছি। চাচা হৃদরোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসক তাকে ওপেন হার্ট করাতে হবে জানিয়ে বিদেশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। সে সময় দেশে কার্ডিয়াক সার্জারি শুরু হয়নি। দেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় চাচার মৃত্যু হয়। সেদিন থেকে কার্ডিয়াক সার্জন হওয়ার পণ করি। এ জন্য এমবিবিএস পাস করার পর কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে কাজ শুরু করি ল্যাবএইড হাসপাতালে। এরপর হার্ট ফাউন্ডেশনেও কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে চাকরি করি। ২০০৯ সালে কার্ডিয়াক সার্জারি বিষয়ে এমএস কোর্সে ভর্তি হই। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতেও যোগদান করি।' সোর্সঃ সমকাল ৩০ আগস্ট ২০১৯

বাড়ি ফিরল নূপুর

November 13, 2020 by Team Asraf Sium
ittefaq-nupur-m-1.jpg

পাবনার সুজানগর এলাকার বাসিন্দা তাঁত ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান-আঞ্জু বেগমের ঘর আলো করে একটি কন্যাশিশু জন্মগ্রহণ করে। তার আগমনে বাঁধভাঙা আনন্দে মেতেছিল পুরো পরিবার। মেয়ের নাম রাখেন নূপুর আক্তার। কিন্তু সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি তাদের। প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকে মেয়েটি। খাওয়া-ঘুমও ঠিকমতো করে না। এ কারণে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক বৃদ্ধিও ঘটেনি তার। বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার দেখানোর পরও অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। পাবনা জেলা শহরে ডাক্তার দেখানোর পর মেয়ের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন মা-বাবা। তখন নূপুরের বয়স সাত। চিকিৎসক তাদের জানিয়েছিলেন, নূপুর জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায়ই তার হৃদযন্ত্রে ছিদ্র ছিল এবং ওই ছিদ্র নিয়েই সে জন্মগ্রহণ করে। মিজানুর-আঞ্জু দম্পতির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। মেয়েকে সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তারা। কিন্তু চিকিৎসকরা বলেছেন, হার্টের ওপরের দিকে ছিদ্র ছিল। তাই ধরা পড়েনি। জন্মের পরপর জন্মগত হৃদরোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা করা সহজ হয়ে যায়। এ ছাড়া ওপেন হার্ট পদ্ধতিতে চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব ছিল না। এ অবস্থায় কেটে যায় আরও পাঁচ বছর। অবশেষে গত ২৫ আগস্ট সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে নূপুরের সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে। তবে ওপেন হার্ট নয়, তার সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে এমআইসিএস (মিনিমাল ইনভাসিভ কার্ডিয়াক সার্জারি) পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতির সুবিধা হলো- পুরো বুক না কেটে শুধু পাঁজরের ৪ ও ৫ নম্বর হাড়ের মাঝখানে দেড় থেকে দুই ইঞ্চির মতো ছোট্ট একটি ছিদ্র করে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব। কাটাছেঁড়া ছাড়া হার্টের অস্ত্রোপচারের ঘটনা বিশ্বের অনেক দেশে প্রচলিত থাকলেও দেশের সরকারি ব্যবস্থাপনায় এটিই প্রথম।

রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. আশ্রাফুল হক সিয়ামের নেতৃত্বে একদল তরুণ চিকিৎসক এমআইসিএস পদ্ধতিতে ১২ বছর বয়সী নূপুরের সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে ডা. আশ্রাফুল হক সিয়াম সবচেয়ে তরুণ। এই তরুণ চিকিৎসকের হাত ধরেই কার্ডিয়াক সার্জারিতে আরেক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নূপুরকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল ত্যাগ করার আগে তার সঙ্গে আইসিইউ বিভাগে কথা হয়।

‘কেমন লাগছে?’

‘অনেক ভালো লাগছে, শরীরে কোনো ব্যথা নেই।’ হাসিমুখে নূপুরের জবাব।

পাশে থাকা তার মা আঞ্জু বেগম জানান, অনেকদিন পর মেয়ের এমন হাসিমাখা মুখ দেখতে পাচ্ছি। এটি সবচেয়ে আনন্দের। চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছেন, নূপুর এখন পুরোপুরি সুস্থ। এখন থেকে সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। হাসপাতাল ত্যাগের আগে তিনি কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

গত ১৯ আগস্ট নূপুরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২৫ আগস্ট সার্জারি সম্পন্ন হয় তার। গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় তাকে। নতুন জামা-কাপড় কিনে দেন চিকিৎসকরা।

সাত দিন পর নূপুরকে পরবর্তী ফলোআপের জন্য হাসপাতালে আসতে হবে। এক মাস পর পরবর্তী ফলোআপ। এরপর আর আসতে হবে না তাকে।

এমআইসিএস পদ্ধতিতে সার্জারির বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. আশ্রাফুল হক সিয়াম বলেন, ‘ওপেন হার্ট করতে হলে রোগীর বুকের মাঝখান বরাবর কেটে ফেলতে হয় পুরোপুরি। এতে করে রোগীর শারীরিক ধকল সহ্য করতে হয় অনেক। দেড় থেকে দুই সপ্তাহ হাসপাতালে অবস্থান করতে হয় রোগীকে। ক্ষত শুকাতে প্রয়োগ করতে হয় অনেক ওষুধ। তা ছাড়া রোগীর স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতেও দেড় থেকে দুই মাস লেগে যায় এবং চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। কিন্তু এমআইসিএস পদ্ধতিতে বুকের ডান পাশের পাঁজরের ৪ ও ৫ নম্বর হাড়ের মাঝখানে দেড় থেকে দুই ইঞ্চির মতো ছিদ্র করে সার্জারি করা সম্ভব। কাটাছেঁড়া না হওয়ায় রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। সার্জারি হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি ফিরতে পারে।’

কার্ডিয়াক সার্জন হওয়ার প্রত্যয়ের কথা জানাতে গিয়ে ডা. সিয়াম বলেন, ‘তখন কেবল এমবিবিএস ভর্তি হয়েছি। চাচা হৃদরোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসক তাকে ওপেন হার্ট করাতে হবে জানিয়ে বিদেশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। সে সময় দেশে কার্ডিয়াক সার্জারি শুরু হয়নি। দেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় চাচার মৃত্যু হয়। সেদিন থেকে কার্ডিয়াক সার্জন হওয়ার পণ করি। এ জন্য এমবিবিএস পাস করার পর কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে কাজ শুরু করি ল্যাবএইড হাসপাতালে। এরপর হার্ট ফাউন্ডেশনেও কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে চাকরি করি। ২০০৯ সালে কার্ডিয়াক সার্জারি বিষয়ে এমএস কোর্সে ভর্তি হই। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতেও যোগদান করি।’

ডা. সিয়াম বলেন, ‘এমএস কোর্স সম্পন্ন করার পর ইউরোপ, আমেরিকা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কার্ডিয়াক সার্জারির আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করে এমআইসিএস পদ্ধতির কথা জানতে পারি। তখন থেকে দেশে এই পদ্ধতি চালুর বিষয়ে পরিকল্পনা করতে থাকি। কিন্তু দক্ষ জনবল, যন্ত্রপাতির প্রয়োজন ছিল সেজন্য, যেগুলো দেশে নেই। এরপর বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালককে অবহিত করি। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হন। তিনি পরিচালককে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নির্দেশ দেন। যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়, কিন্তু দক্ষ জনবল নেই। এরপর নিজেই অর্থ ব্যয় করে আরও দুই সহকর্মীকে নিয়ে ভারতের আহমেদাবাদে ইউএন মেহতা হাসপাতালে গিয়ে এই সার্জারির ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। এরপর দেশে ফিরে গত ২৫ আগস্ট সেটির সফল প্রয়োগ ঘটাই। জন্মগত হৃদরোগ দিয়ে শুরু হলেও ধাপে ধাপে হার্টের ভাল্‌ভ এবং বাইপাস সার্জারিরও এই পদ্ধতিতে করতে চাই।’ ডা. সিয়াম। জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই কার্ডিয়াক সার্জারির সব চিকিৎসা এমআইসিএস পদ্ধতিতে শুরু করবেন তারা।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেন, ‘তরুণ কার্ডিয়াক সার্জনের সাফল্যে পরিচালক হিসেবে আমি গর্বিত ও আনন্দিত। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সার্জারি করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেই যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়। চিকিৎসকরা নিজ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিয়ে এই সার্জারি সম্পন্ন করেছেন। তাদের আগ্রহের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। আশা করি তরুণ চিকিৎসকরা দেশের চিকিৎসাসেবা ও পেশাকে এভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে নেবেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরাও তাদের উৎসাহ দেবেন। তাহলেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাও অনন্য স্থানে পৌঁছাবে।’

সোর্সঃ সমকাল


24/7 EMERGENCY NUMBER (+880 1720-834878)

Call us now if you are in a medical emergency need, we will reply swiftly and provide you with a medical aid.


All Right Researved by Team Asraful Sium